গল্প

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি

ডানে দিকে, আরেকটু সামনে ওই তো। হিম এগিয়ে যা। মার মার আ হা কি করলি মিস হয়ে গেলো তো! এমন করে ঘুমের মধ্যেই একা একাই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলছিল রাকিব। রাকিবের এই চেঁচানো শুনে তার মা ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠল। কি হয়েছে বুঝতে পারছে না। তড়িঘড়ি করে মোবাইলের টর্চ জালাল। তবে রাকিব কিন্তু থেমে নেই তার কথা চলছে। তার মা তাকে ডাকতে শুরু করল। কে শোনে কার কথা সেতো সপ্নের রাজ্যের রাজকুমার। অনেক খন ডাকার পরে যখন কাজ হলোনা তখন রাকিবের মা বাধ্য হলো তার মুখে পানি দিতে। পানি দেবার সাথে সাথেই ঘুম ভাংল রাজকুমারের। তার মা যখন জিজ্ঞেস করল ঘুমের ঘরে কি বলছিস আবল-তাবল? রাকিব বলে ও কিছুনা সপ্নে দেখছিলাম এবার ঘুমাও।

রাকিবের বয়স ৮ বছর। সে অনলাইন গেমস এ আসক্ত বললেই চলে। আর রাতের ঘটনাটি তারই বহিঃপ্রকাশ। মামা কাছথেকে এই গেমস খেলা শিখেছে রাকিব। শুধু মামা না সেই এলাকার ৮০% ছেলেরা এসকল গেমস এ আসক্ত।

রাকিব মামা বলতে পাগল। শুধু এই একটা কারনেই সেটা হলো গেমস। মামার মোবাইল আছে মামা আসলে গেমস খেলা যাবে এটাই তার মামা ভক্তির মূল কারন। এখন আগস্ট মাস চলছে আগামী মাসে মামা আসার কথা। মামার অপেক্ষায় দিন কাটছে খুব কষ্টে। বাসার বাহিরে আর রাস্তার মোরে ছেলেদের মেলা বসে। এমন অবস্থা সকলে যখন একত্রিত হয়। তখন শুধু গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। আর তাদের বাসে কোনো বাড়িতে যদি আগুন লাগে তাহলে এরা তা টেরই পাবেনা এমন অবস্থা।

রাকিব হাতের কাছে কারো মোবাইল পেলেই হলো, গেমস গেমস আর গেমস। তার বাবার দুটো মোবাইল ইতিমধ্যেই নষ্ট করা হয়েগেছে। মানুষ ছোট হলে কি, খেলতে গেলে সে বড় মাপের প্লেয়ার।

রাকিবের কাকা গেমস খেলা বিশেষ করে এমন ফ্রি ফায়ার, পাবজির মতো গেমস কখনোই পছন্দ করেনা। সে একদিন বাসায় বসে তার ভাবিকে বলছলেন, কিছুদিন আগে টিভিতে দেখলাম গেমস খেলার টাকা না দেওয়ায় বাবাকে খুন। কি মর্মান্তিক ঘটনা সামান্য গেমস এর জন্য নিজের বাবাকে খুন করতে পারে। ভাবি একথা শুনে তো মাথায় হাত, হায় হায় একি বলছ সামান্য গেমসের জন্য বাবা কে খুন। ভাবি শুধু বাবা নয় আজ ভোরে পত্রিকায় দেখলাম, চার যুবক রেললাইনে বসে গেমস খেলা অবস্থায় মৃত্যু। মানে তারা রেললাইনে বসে গেমস খেলছে এমন সময় ট্রেন চলে এসেছে তারে কোনো হুসই নেই। তারা টেরই পায়নি কখন ট্রেন এসেছে। ভাই বললেন, এই সব গেমস সকল যুব সমাজকে নষ্ট করছে।

তাদের এ সকল কথাই আড়াল থেকে শুনছিল রাকিব। শুনলেবা কি? কথায় আছে পিরিতের পেত্নী ও ভালো। তারা যাই বলুকনা কেন গেমস তো তাকে খেলতেই হবে।

একদিন এমন অবস্থা হয়েছে যে, রাকিব তার বাবার মোবাইল থেকে গেমস খেলছিল। তখন তার মা খাবার জন্য যেই ডাক দিল। ওমনি তার মায়ের উপরে চেঁচিয়ে উঠল। তার মা তার এই ব্যাবহারে প্রচন্ড কষ্ট পায় ও অবাক ও হয়। আমার ছেলেটার এ কি হচ্ছে।

যাইহোক মামার আসার কথা আগামি মাসে কিন্তু সে অগেই চলে এসেছে। মামাকে দেখে আনন্দের আত্তহারা ভাগিনা। দুপুরে খাবার পরে মামা ভাগিনা পিছানায় না ঘুমামিয়ে নেমেছে খেলার মাঠে। মামা ভাগিনি কথা আর গোলাগুলির শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনার উপায় নেই। পাশের ঘর থেকে রাকিবের কাকা এসে বললেন, বাঙালী জাতীকে ধংস করে দিল এ সকল গেমস। রাস্তা-ঘাটে কোথাও বেরোবার অবস্থা নেই। মামা বললেন, ধংস না সমাজের আর রাষ্ট্রের উন্নতি হচ্ছে। অনেকে এসকল গেমস খেলা অনেক টাকা উপার্জন করছে। কাকা বললেন, তেমন ক্ষতিও করছেন। পড়াশোনায় কারো মন নেই, খেলার মাঠেও কেউ যায় না। আর এসকল গেমস খেলে যত বন্দুকের নাম যেনেছে, এখন মনে চাইলে আর কারো সাথে শত্রুতা থাকলে। এসকল বন্দুক কিনে তাকে মারতেও কারো বিবেক বাধা দেবে না। মামা বললেন, শুধু এটাই দেখলেন? আরে এখন যারা গেমস খেলছে এরা তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। একথা শুনে কাকা রাগ করে চলে গেলেন।

কাকা চিন্তা করছে এই গেমস এর কারণে আজ খেলার মাঠে কাউকে দেখা যায় না। বাচ্চাদের বইয়ের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। কি শিখছে এরা? এরমধ্যে আবার মরণব্যাধি করোনার প্রভাব। যাদের মোবাইল নেই, অনলাইন ক্লাসের বাহানায়। মোবাইল, ওয়াইভাই সবই এখন বাসায়। আবার এই গেমস খেলে নাকি বিশ্ব যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সব পাগলের বংশধর। চিন্তা করতে করতে এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পরে।

পরেরদিন দুপুরে খবরে টিভিতে উপস্থাপিকা বলছে, আগামীকাল থেকে পাবজি ফ্রি ফায়ারের মত ক্ষতির অনলাইন গেমস বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। টিভিতে এ খবর শুনে রাকিবের মা, বাবা, কাকা সকলেই অনন্দিত হল। যেন তারা মনে মনে এমনই কিছুর অপেক্ষায় ছিলেন।

অন্যদিকে রাখিবে খবর দেখে ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর বলছে, গেমস খেলতে না পারলে। আমি আর পড়াশুনা কোরবনা। বাবা বলছে ক্রিকেট খেলবে, ফুটবল খেলবে। না তাতে তার হবে না তার ওই এক কথা। সে অনলাইন গেমসই খেলবে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে হাইকোর্টের নির্দেশ মানা হলো না। এই মরণব্যাধি গেম এখনো চলছে।

লেখক সাব্বির ফকির।
খালিশপুর খুলনা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button