উপন‍্যাসধারাবাহিক গল্প

জোর করে লিখনি পর্ব ২

সেদিনের পর থেকে সে আমাকে মাজে মধ্যে এসে দেখে যেতো।আমার মাজে নাকি তার ছেলেকে খুঁজে পায় তাই। একদিন সে আমাকে দেখতে গেলো অন্য দিনের মতো একা নয়। তার সাথে ছিল তার সহধর্মিণী আর মেয়ে। আমার কাছে এসে মাথায় হাত রেখে কেঁদে কেঁদে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আর বলতে লাগলো তুমিই আমার ছেলে তুমিই আমার ইউজার্সিফ। এই দেখেছো এটাই আমার ইউজার্সিফ। আমার ইউজার্সিফ আবার জীবিত হয়েছে। বাবা তোমাকে আবার ফিরে পাওয়ার খুশিতে আমি এই জুমায় মসজিদে রসেরগোল্লা দিব। আর হুজুর কে বলবো খুব সূরে যেন নবীজর শানে মিলাদ পড়ে। আমারও অনুভব হতে লাগলো মায়ের আদর। কেন যেন মনে হয় তিনিই আমার মা। তিনিই পারবে আমাকে মায়ের শুণ্যতা পূর্ণ করতে।

তার আবেগকে থামিয়ে বললো বাবা তুমি আমাদের বাসায় বেড়াতে যাবে?  আমি বললাম দেখুন আমি এখানে চাকরি করি। আমার থাকার কোনো জায়গা নেই। এই পৃথিবীতে আমার বলতে কেউ আছে কি না আমি জানিনা। আমার কাঁদে হাত রেখে বললো বাবা এরকম বলতে নেই এখন তোমার আমরা আছি। চলো আমাদের সাথে চলো। এখন থেকে আমরাই তোমার মা বাবা।

 

সেদিন আমার মনে হয়েছিল আমি কল্পনার জগৎে হারিয়ে গেছি। কিন্তু না আসলে সবকিছুই সত্যি হয়েছিল। বাসায় এসে আমাকে অরুনির সাথে পরিচয় করিয়ে দিল বাবা। অরুনি আজ থেকে এটাই তোমার ভাই ইউজার্সিফ। অরুনিও মাথা ঝুলিয়ে হ্যা বললো। আমাকে একটা রুম দেখিয়ে দিল। এটাই এখন থেকে আমার রুম। রুমটা বেশ গোছানো ছিল। আবার দেখে মনে হচ্ছিল অনেক আগে রুমটা ব্যাবহার হয়েছে বেশ কিছুদিন হয়েছে খালি। রুমটির পাশেই একটা হাওয়া বারান্দা ছিল। আর বারান্দায় রাখা ছিল একটা মিষ্টি টিয়া পাখি।

 


টিয়াপাখি,…………..আমি বারান্দায় গেলাম টিয়া টির কাছে। ওরে বাবা আমাকে দেখে কি লাফাতে শুরু করলো পুরো খাঁচা জুড়ে। আর চেচিয়ে বলতে শুরু করলো জার্সিফ তুমি এসেতো? জার্সিফ তুমি এসেতো?  (ও পুরো নামটা বলতে পারেনা শুধু জার্সিফ বলে) এই দেখেছো কে কোথায় আছো দেখো জার্সিফ এসেতে। আমি শুধু শুনেছি পাখিতে কথা বলে কখনো দেখিনি কিন্তু আজকে ভাগ্য হলো। আমি একটু কাছে এগিয়ে বললাম বাহ তুমি কথা বলতে পারো? নাম কি তোমার?  থোতলিয়ে বললো আরে তুমি আমি টিটুকেও ভুলে গেছো দেখছি!  তোমরা মানুষ এমনই হও অনেক কাছের মানুষকেও ভুলে যাও দূরে গেলে। আচ্ছা আমি টিটু তোমাকে কখনো আমার নাম বলবো না কখনো না। তোমার সাথে কথাও বলবো না যাও অপিমান (অভিমান)। আরে আমিতো তোমার সাথে মজা করেছি টিটু। তুমি টিটু। ও একটু হেসে আবার বললো জানো তোমাকে আমি কতো মিত (মিছ) করেছি! যখন সূর্য উঠতো তখন আমি সূর্যকে বলতাম এই সূর্য এই সূর্য তুমি তো অনেক উপরে থাকো,তুমিতো অনেক দূর দেখো তোমার তেজ রোদ অনেক গ্রামে যায়। তুমি আমার জার্সিফকে দেখলে আমাকে একটু বলবে। আবার চন্দ্রকে বলতাম এইযে চন্দ্র তুমিতো রাতে ঘুমাও না। তুমি সবার উপরে থাকো আমার জার্সিফকে দেখলে আমাকে একটু বলবে।  কিন্তু কেউই আমাকে কিছু বলেনি। তোমায় নিয়ে আমি অনেক চিন্তিত ছিলাম। হুম এখন আর চিন্তা করতে হবে না আমি এসে গেছি।

 


আমার মতো…………বিছানার পাশে একটা পড়ার টেবিল। সেই টেবিলে কিছু বই রয়েছে। যেমন দ্যা হান্ড্রেড, আরও কয়েকটি উপন্যাস, তার মধ্যে একটা বই পেলাম ইকবাল স্যারের আধ ঘন্টে স্কুল। বইটি নাকি স্যারের ছোটোবেলার জীবন নিয়ে সাজানো। খুবই মজার একটি বই। পড়লে বলতে হবে স্যারের ছোটো বেলা খুব ভালো কেটেছিল। স্যার নাকি একদম ছোটো বেলা স্বরল সোজা ও ভিতু ছিল। পড়ে বয়সের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে গেলো।

তার পাশেই রাখা ছিল বাঁধানো আকারে একটা ছবি। ছবি টা দেখে মনে হলো আমি। হয়তো কোনো আয়না দেখেছি। কিন্তু আবার মনে হলো না। আমার মুখে ঠোঁটের নিচে ডান দিকে একটা তিল আছে। কিন্তু এই ছবিতে সেটা নেই। তাই সত্যি হচ্ছে আমি একটা ছবিই দেখছি। ছেলেদের মুখে তিল থাকা মানে সেই ছেলেটা মেয়েদের ক্রাস। মেয়েদের ছিড়িয়াল নাকি লেগেই থাকে এমন ছেলেদের পিছে। কিন্তু আমার পিছনে মেয়ে তো দূরের কথা কোনো দিন আমার ছায়াটা পড়ছে নাকি সন্দেহ হচ্ছে। এই তিলটা আমার না হয়ে এমন ছেলেদের হলে ভালো হতো যারা সারাদিন প্রেম খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু আমার দ্বারা ওসব হবে না। মেয়েদের সামনে পড়লে লজ্জায় কখন পালাবো সেই চিন্তা। তাকে জড়িয়ে ধরে বলবো এই মে আমি তোমাকে ভালোবাসি এমন টা তো কল্পনাও করতে পারিনা।

ছবি দেখে ভাবছি এটাই আমার বাড়ি হবে আর এরাই আমার পরিবার। কিন্তু এটাতো একটা ভাবনা। তাহলে সত্যি কোনটা?  আমার মা আমার বাবা আমার পরিবার কোথায়?  এদের নিয়ে ভাবতে গেলে মাথায় কোনো কাজই করে না।  শুধু সিগারেটের ধোয়ার মতো লাগছে । নাকি আমার বাড়ি চাঁদের দেশে! কয়েকদিন আগে একটা রোবট চাঁদে একটা কুরে ঘর দেখেছে। হয়তো সেটাই আমার ঘর হবে। কিন্তু সিউর না রোবট জানটি এখনো ঘরটির কাছে যায়নি। কাছে যেতে আরো সময় লাগবে। ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। রোবট জানটি সত্যিই যদি বলে ঘরটি আমার তাহলে নাসার কাছে গিয়ে একটা রকেট নিয়ে তরিঘরি করে চলে যাবো।

 


কবরের মানুষ……….আমাকে নিয়ে সবার মুখে মুখে কথা চলছে। রাস্তাঘাটে সব জায়গায় কানে কানে ফিসফিস করছে লোকে। আমি নাকি কবরের মানুষ। আমি না কি আবার জীবিত হয়েছি, দ্বিতীয় প্রান পেয়েছি ইত্যাদি। বাচ্চারা আমাকে দেখলে দৌড়ে পালিয়ে যায়। মানুষের মুখে শুনে শুনে অরুনির নানি এসেছে আমায় দেখতে। আমায় দেখেই জড়িয়ে ধরছে। আর জোরে জোরে চেচাচ্ছে নানা ভাই নানা ভাই বলে। কয়েকদিনের জন্য আমাকে নিয়ে যাবে নানা বাড়ি। সাথে অরুনি ও মা যাবে। নানা বাড়ি বেশি দূরে নয় বাসা থেকে রিকশায় ১৫ টাকা ভাড়া। পায়ে হেটে গেলে বিশ মিনিটের রাস্তা। আমরা রওনা করলাম। এক রিকশায় আমি আর অরুনি আর অন্য রিকশায় মা আর নানি। আজকে আকাশটা জিম জিম করছে। আমি তাকিয়ে আছি প্রকৃতির সৌন্দর্যের দিকে। অরুনিকে এক সময় আমি বললাম আপনাদের গ্রাম টি অনেক সুন্দর। অরুণি হাত দিয়ে আমার মুখ ঘুড়িয়ে বললো আপনি না তুমি করে বলবে। এবার তুমি করে আবার বলো কি বললে। আমি আবার বললাম তোমাদের গ্রামটি অনেক সুন্দর। অরুণি বললো  একদম তোমার মতো সুন্দর। কিন্তু একটা হাসি দিয়ে বললো। আমি একটু লজ্জা পেলাম। আবার বললো কি লজ্জা পেয়েছো?  তুমি তো দেখছি অনেক লাজুক ছেলে।

 

আমায় দেখার জন্য অনেক মানুষ ভিড় জমিয়েছে। বাড়ির উঠনে। মনে মনে ভাবলাম আমাকে দেখার জন্য এত মানুষ! আবার নিজেই বললাম ও আমিতো চাঁদের ছেলে তাই। এসব মানুষ তো চাঁদের ছেলে কখনো দেখেনি। অরুনির একটা মামাতো ভাই ছিল ওর নাম জিসাফ। খুব দুষ্ট বড়োমানুষী আর সাহসী। আমার কাছে এসে বললো এসেছো ভাইয়া তোমাকে অনেক দিন পড়ে দেখেছি। এতদিন কোথায় ছিলে?  কি করেছো?  সব কাজ এবং প্রতিটা নিঃস্বাস সম্পর্কে আমায় বলবে। কথাগুলো একদম নিসার মতো করে বললো। আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। হয়তো ওর বয়স তিন বতসর হবে কিন্তু কথা শুনে মনে হলো ৪০ বৎসর হবে ভাবতে ছিলাম।তখনই একটা ধমক দিয়ে আবার বললো এই আমি ছোটো ভাই হিসেবে জিজ্ঞেস করবে না আমি কেমন আছি? সত্যিই ঝাড়ি শুনে আমি লাফিয়ে উঠলাম। পাস থেকে মা ইশারা বললো ওর কথার উত্তর দেউ তাড়াতাড়ি করে।আমি বললাম ও হ্যা কেমন আছো জিসাফ?

 


লিমিয়া………. বলতে গেলে বলতে হবে এখনো দুপুর। চারিদিকে রোদে ঝলমল করছে। কিছুক্ষণ আগে দুপুরের খাবার খেয়েছি। একটু ঘুমোতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু জিসাফ সে ঘুড়তে যাবে আমাকে নিয়ে। আর সে যেহেতু বাড়ির বড়োমেয়া তাই তার কথা শুনতেই হবে না শুনে কোনো উপায় নেই। দুজনেই পথ ধরে হাঁটছি। মাজে মধ্যে কথা বলছি। আর উপভোগ করছি গ্রামের সৌন্দর্য। একটু দূরে যেতেই দুটো মেয়ে দেখতে পেলাম কোথাও যাচ্ছিল। জিসাফ ছোট্ট একটা ডিল নিয়ে একটা মেয়ের গায়ে মারলো। মেয়েটি চেচিয়ে বললো কেরে কে?  পিছনে তাকিয়ে বললো জিসাফ তুমি! আমার গায়ে ডিল মেরেছে কে?  লিমি আফু আমি মেরেছি কেন খুব লেগেছে নাকি ?  না লাগেনি কিন্তু ভয় পেয়েছিলাম। কিসের ভয় লিমি আফু কোনো জিন ভুতের?  আরে না এই দুপুরে কোনো ভুত আসে নাকি! ভাবছিলাম কোনো ছেলে ভুত হয়তো হবে।

আচ্ছা জিসাফ তোমার সাথে এ কে?  আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো। লিমি আফু এটা আমার ভাই। ওদের মধ্যে বেশিক্ষণ কথা হলো না। কিন্তু যেতুটুকু হয়েছে সেইটুকু সময় ঐ মেয়েটির চোখ ছিল আমার উপরে। জিসাফ চলো অনেক হেঁটেছি এখন চলো পা ব্যাথা করছে। আজকে যদি গ্রামের সব দেখে ফেলি তাহলে কাল কি দেখবো?  চলো কাল আবার আসবো। হুম চলো ভাইয়া। বাড়ির কাছে এসে খুব চেচামেচি শুনতে পেলাম। কে যেন কাকে বকছে। আর একটু কাছে এসে দেখলাম অরুনির নানি আর অন্য একটি মহিলা ঝগড়া করছে। কিন্তু সেটা আমাকে নিয়ে। অরুনির নানি বলছে আমার নাতিকে নিয়ে যদি আর একটি বাজে কথা বলো তাহলে তোমাকে রৌদ্রে শুকিয়ে পিয়াজ দিয়ে তেলে ভেজে আচার বানিয়ে সারাজীবনের মতো বৈয়মে ভরে রাখবো।  …… পর্ব সমাপ্ত 

 

লেখক আবুল হাসান বাউফলী 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button