গল্প

এভাবেও ভালোবাসা যায় – তন্ময় দাস 

ভালোবাসিস?
প্রশ্নটা হঠাৎই ভেসে এসেছিলো উল্টোদিক থেকে।কলেজ স্ট্রিটের রাস্তা,সূর্য আস্তে আস্তে ডুবছে পশ্চিমপ্রান্তে।কলেজ স্ট্রিটে তখন প্রচুর লোকের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি আমরা দুজন।পাঁচদিন টানা কথা না বলার পর আজকের এই সন্ধ্যা।দুপুরে হঠাৎই ফোন-
দেখা করবো।তোর মতামত শুনতে ফোন করিনি।তুই আসছিস সেইটা বলার জন্যই ফোন করেছিলাম।ঠিক সন্ধ্যে ৬টা কলেজ স্ট্রিটের যেই দোকানটা থেকে বই কিনি সেই দোকানটার সামনে,মনে থাকে যেন।
টানা পাঁচদিন কথা না হওয়ার পর ফোনে গলাটা শুনে ভিতরে ভিতরে প্রচন্ড আনন্দ পেলেও প্রকাশ করলাম না।বিকেলে একটা টিউশনি ছিল মেডিকেল কলেজের কাছেই।সেটা শেষ করেই ছুটেছি গন্তব্যের দিকে।তাড়াহুড়োয় একদম খেয়াল ছিল না যে পকেটে পড়ে আছে মাত্র ৫০ টাকা।মাস শেষ না হলে টাকার আশা করাও বৃথা।যখন নির্দিষ্ট দোকানের সামনে গিয়ে পৌঁছালাম তখন ঘড়ি বলছে ৬:৩০ বেজে গেছে।যার ডাকে ছুটতে ছুটতে এলাম,এসে দেখি সে অনেক আগেই এসে গেছে।দেখি সে একটা ‘গীতবিতান’ খুলে নিয়ে পড়ছে।আমিও আস্তে আস্তে তার সামনে গিয়ে বইয়ের স্তূপ থেকে একটা ‘সঞ্চিতা’ তুলে চোখ বোলাতে লাগলাম।উল্টোদিক থেকে কোনো শব্দ নেই।মাথার ভিতরে অসংখ্য চিন্তা পাক খেতে থাকলো;হঠাৎ এইভাবে ডাকা,এইভাবে চুপ করে থাকা।আমিও কিছুই বলতে পারছি না।পাঁচ মিনিট দুজনেই চুপচাপ।এই পাঁচ মিনিট যেন গত পাঁচ দিনের সমান দুর্বিষহ।হঠাৎই উল্টোদিক থেকে ভেসে এলো প্রশ্নটা-
 ভালোবাসিস?
কি বলবো বুঝতে না পেরে মনের ভিতর উত্তর হাতড়াতে লাগলাম।উত্তর আমার জানা কিন্তু ওই মুহূর্তে সব জানা জিনিসগুলোও আমার কাছে অজানা হয়ে গেল।চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি।আবার ভেসে এলো একই প্রশ্ন।কি বলবো কিচ্ছু বুঝতে পারছি না;প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ দেওয়া মানেই একটা দায়িত্ব নিয়ে নেওয়া আর না বলা মানেই একটা দায়িত্বকে অস্বীকার করে এড়িয়ে যাওয়া।আবারো একই প্রশ্ন কিন্তু এইবার বেশ গম্ভীরভাবেই।অনেক ভেবে চিন্তে আস্তে করে বললাম-
হুম্ বাসি…
এটা বলতে এতক্ষণ লাগলো!
আমি চুপ করেই রইলাম।সদ্য কলেজ স্ট্রিটের রাস্তায় রাস্তায় জ্বলে ওঠা নিয়নের আলোগুলো এসে পড়েছে আমার সারা মুখে।অনেকদিন ধরেই সেভ না করা মুখ আর উস্কোখুস্কো চুল দেখেই সে বুঝতে পারলো আমার অবস্থা।সে বললো-
চল্…
কিন্তু কোথায়?
 নরকে…যাবি না?
মনে মনে একটু হাসলাম।মেয়েটাকে বাইরে থেকে দেখে যতটা রাশভারী মনে হয়,ভিতরে সে ততটাই শিশুসুলভ প্রকৃতির।আমায় হাসতে দেখে সে বললো-
 হাসছিস কেন?আমি কি জোকার নাকি?
 না না…হাসছি না তো।
এবার চুপ করে গিয়ে বইটা রেখে ওর পাশে পাশে হাঁটতে লাগলাম।রাস্তার চারপাশে অসংখ্য লোক।তাদের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি দুজনে।ও পড়ে আছে হাল্কা হলুদ রঙের একটা কুর্তি আর সাদা রঙের একটা লেগিন্স আর আমার পরণে যথারীতি সেই একই জিন্স,কনুই অবধি গোটানো ফুল শার্ট ও পায়ে স্যান্ডেল।বেশ কিছুদিন পরিষ্কার করতে না পারার ফলে পোশাকের অবস্থাও ভীষণ শোচনীয়।পাশাপাশি হাঁটার সময় অনেকেই ওর পাশে আমাকে দেখে মেলাতে পারছিল না।তার ফলে আমি আরো সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছিলাম।ও সেটা লক্ষ্য করেছিলো;হঠাৎই ও আমার কনুইয়ের ওপরটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হলো আমি যেন সারাজীবনের জন্য একটা বিশ্বস্ত হাত পেয়ে গেলাম।মনের মধ্যে এতক্ষণ যাবতীয় যা চিন্তা ছিল সব নিমেষে উধাও হয়ে গেলো।হাঁটতে হাঁটতে দুজনে গিয়ে দাঁড়ালাম একটা ছোট্ট চা এর দোকানের সামনে।ও বললো-
চল…চা খাবো।
তা এখানে খাবি?ওই বড়ো দোকানটায় চল।
 না এখানেই খাবো।খাওয়াবি কিনা বল?নাহলে খাবোই না।ব্যাস…
ওর এইরকম বাচ্চা বাচ্চা ব্যবহারের জন্যই আমি বারবার ওর প্রেমে পড়ি।আমি বললাম-
আচ্ছা বাবা…ঠিক আছে চল।
দুজনে গিয়ে দোকানের ভিতরে বসে দু ভাড় চা এর জন্য বললাম।চা এলো,দুজনে চা খেলাম,চা খেয়ে বিল মিটিয়ে আবার আমরা সেই সন্ধ্যার নিয়ন আলোয় ভরা রাস্তায় লোকজনের মাঝে এসে দাঁড়ালাম।সেই বিশ্বস্ত হাতটা তখনো আমাকে একা হতে দেয়নি।পরম প্রাপ্তিতে আমার চোখ বুজে আসছিলো।রাস্তা দিয়ে পাশাপাশি হেঁটে চলেছি দুজনে,পাশের একটা দোকান থেকে ভেসে এলো “এই পথ যদি না শেষ হয়,তবে কেমন হতো তুমি বলোতো?”হঠাৎ গানের মাঝেই ভেসে এলো আর একটা প্রশ্ন-
কতটা ভালোবাসিস আমায়?
জানি না…
বল শয়তান…কতটা ভালোবাসিস?
বললাম তো জানি না।শুধু জানি তোকে ভালোবাসি।ব্যাস…
কেন বাসিস?
– না বেসে থাকতে পারি না তাই বাসি।কিন্তু তুই কেন বাসিস?তুই তো আমার থেকে আরো ভালো ছেলে পেতিস,তাহলে?আমি কি তোকে কিছু দিতে পারবো বল?এখনো টিউশনি করে হাতখরচ চালাতে হয়;মাস শেষ হওয়ার আগেই পকেটে টান পড়ার ভয়ে থাকতে হয়।আমার কাছে তুই কি পাবি বল…তারওপর আমার জীবন অনিশ্চিত।দিন দিন সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে যাচ্ছি।চাকরি-বাকরির যা অবস্থা ভবিষ্যতে কি করবো কিচ্ছু জানি না।এই মুহূর্তে তাই বলছি ভেবে দেখ তুই কি করবি?
এতক্ষণ আমার সব কথাই সে মন দিয়ে শুনছিলো।কথা শেষ হতেই সে বললো-
আমি আছি তো তোর পাশে।
ওই একটা কথাতেই আমার সব কষ্ট চলে গেল।আমি মনে মনে ওর কাছে নত হয়ে নিজেকে সমর্পণ করে দিলাম।ও বলতে থাকলো-
শোন,আমার কিচ্ছু লাগবে না।শুধু তুই থাকলেই হবে।আর একটা কথা সবসময় মনে রাখবি আমি কিন্তু অন্য বেশিরভাগ মেয়েদের মতো নই যে একটা ছেলের ভালো সময়ে তার কাছে আসবো আবার তার খারাপ সময়ে ছেড়ে চলে যাবো।আমার কাছে perfect এর থেকে permanent টা বেশি দরকার।আর শোন,আমি যেমন তোর এই খারাপ সময়ে তোর পাশে আছি তেমনি তুই যদি ভবিষ্যতে কিছু নাও করিস তাও আমি তোর পাশে থাকবো।আর আমার ওইসব ভালো ভালো খাবার,দামি দামি উপহার,ভালো ভালো জায়গায় ঘুরতে যাওয়া এইসব কিছুই চাইনা।এই যে তোর সাথে একসাথে বসে ভাড়ে করে চা খাওয়া,নিয়ন আলোর মধ্যে দিয়ে কলেজ স্ট্রিটের রাস্তায় হাত ধরে হাঁটাতেই আমি আমার সব কিছু পেয়ে যাই।তাই আর কোনোদিন এইসব কথা বলবি না।তুইই আমার কাছে সব।বুঝলি পাগল?
বলেই আমার কনুইটা আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।আমি তাকালাম ওর দিকে।জানি না কেন ওর চোখের কোণায় দুটো মুক্তোদানা দেখতে পেলাম;যেটা আমি কখনোই সহ্য করতে পারি না।হাত দিয়ে মুক্তোদানা গুলোকে ঝরিয়ে দিয়ে বললাম
বুঝেছি পাগলি।আচ্ছা,এইভাবেও কি ভালোবাসা যায়?
হুম্ যায়…যাওয়ালেই যাই।সবাই ভালোবাসাতে শুধু রূপ,টাকা-পয়সাই খোঁজে না;কেউ কেউ ভালোবাসাতে বিশ্বাস,ভালোবাসা,নির্ভরতা ও স্বাধীনতাও খোঁজে।
আচ্ছা বুঝলাম।(মনে মনে হাসলাম)
That’s like a good boy…বল ভালোবাসিস তো?ভেবে বলবি কিন্তু…
হুম্ বাসি,বাসি,বাসি।
আচ্ছা চল…অনেক ভালোবেসেছিস।
আবার দুজনে সেই নিয়ন আলোর সরলরেখার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে থাকলাম একসাথে,পাশাপাশি।বিশ্বস্ত হাতটা কিন্তু তখনো আমাকে আগলে রেখেছে প্রবল ভালোবাসাতে।

Related Articles

Back to top button